বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একাকীত্ব এটা এমন এক বেদনা।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একাকীত্ব এটা এমন এক বেদনা —
যেটা ধীরে ধীরে প্রতিটি ঘরে সত্যি হয়ে যায়।
বৃদ্ধ বাবা-মা’র নিঃশব্দ জীবন,
যেখানে ভালোবাসার ভাষা হারিয়ে গেছে —
কেবল অপেক্ষা রয়ে গেছে, এক ফোন কলের, এক আলিঙ্গনের, একটিমাত্র “কেমন আছো?” কথার।
একদিন যে ঘরে হাসির শব্দে সকাল হতো,
আজ সেই ঘর নিঃস্তব্ধ। আগে মা বলতেন,
“এই ঘরটা তোমাদের হাসিতে বাঁচে।”
এখন সেই ঘরে মশার শব্দও বড় শোনা যায়।
বাবা পুরনো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন —
“সময়টা যেন থেমে গেছে।”
একসময় সন্তানের জন্য তারা রাত জেগেছেন,
আজ তারা একা বিছানায় জেগে থাকেন —
কোনো শব্দ শোনার আশায়।
বাবার কানে হিয়ারিং মেশিন, মায়ের চোখে চশমা —
তবুও তারা বারান্দায় বসে তাকিয়ে থাকেন,
“আজ কি ছেলে আসবে?”
তাদের পৃথিবী এখন মোবাইলের রিংটোনে সীমাবদ্ধ।
একসময় সন্তান বলত —
বাবা, আমার খেলনা ভেঙে গেছে।”
আর বাবা বলতেন —
“কিছু হবে না, ঠিক করে দিচ্ছি।”
এখন বাবা বলেও না,
“আমার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।”
কারণ, জানেন — সন্তানের সময় নেই।
মা ব্যথা পেলে ওষুধ খান, কিন্তু কারো বিরক্ত করতে চান না।
কারণ, জানেন — এখন সন্তান অফিসে ব্যস্ত।
একসময় সেই বাবা-মাই প্রতিদিন খাবার বানাতেন,
আজ তারা নিজেরাই ভুলে যান খেতে।
কারো ফোন এলে আনন্দে বলেন,
“এই যে, ছেলে ফোন দিয়েছে!”
আসলে ওটা প্রতিবেশীর ফোন,
তবুও মুখে হাসি রাখেন — যেন সন্তান জানে না তাদের একাকীত্বের কথা।
তাদের আলমারিতে এখন পুরনো জামা,
বিয়ের দিনের সাদা শাড়ি,
আর কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া ছবি।
তারা মাঝে মাঝে সেই ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন,
যেখানে সন্তানদের মুখে ছিল হাসি,
আর নিজেদের মুখে ছিল শান্তি।
এখন ছবির মানুষগুলোই বাস্তবের ঘরে নেই।
উৎসবের দিনে ঘরে এখন আর আলো জ্বলে না,
কারণ সন্তানরা বলে — “এই বছরটা একটু ব্যস্ত।”
কিন্তু বাবা-মা তবুও কেক রাখেন,
চিন্তা করেন — “হয়তো হঠাৎ কেউ দরজায় কড়া নাড়বে।”
সেই কড়া নাড়াটা হয় না,
কিন্তু তারা প্রতিদিন শুনতে পান —
নিজের হৃদয়ের ভিতর দরজায় একাকীত্বের শব্দ।
প্রতিবেশীরা জিজ্ঞেস করে —
আপনার ছেলেমেয়েরা তো অনেক বড় হয়েছে,
দেখা করতে আসে না?”
তারা হাসি দিয়ে বলেন,
“ওরা শহরে থাকে, খুব ব্যস্ত।”
এই হাসিটা আসলে মুখে থাকে,
কিন্তু চোখের ভেতর জমে থাকে পানি।
বাবা মাঝে মাঝে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেন —
“আমরা কি ভুল করেছিলাম?”
মা চুপ করে থাকেন,
কারণ উত্তরটা খুব কঠিন —
ভুল তারা করেননি,
শুধু সময়ের সাথে সম্পর্কগুলো পাল্টে গেছে।
ভালোবাসা এখন অনলাইন,
কিন্তু একাকীত্বটা অফলাইনে থেকে গেছে।
বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানুষগুলো আসলে “অসহায়” নয়,
তারা “অপেক্ষমাণ” মানুষ।
যারা একদিন সন্তানের প্রথম পদক্ষেপ দেখেছিল,
আজ সেই সন্তানদের ফেরার পায়ের শব্দ শুনতে চায়।
কেউ কেউ মৃত্যুর আগেও বলে —
“ছেলেকে একবার দেখলে শান্তি পাব।”
কিন্তু সে দেখা অনেকের ভাগ্যে জোটে না।
বাবা-মা বুড়ো হন না বয়সে,
হোন অপেক্ষায়।
প্রতিদিন একটু একটু করে কমে যায় কথা, হাসি, আলো —
তবুও তারা বেঁচে থাকেন আশায়।
আশা, যে একদিন দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকবে তাদের সন্তান,
বলবে —
“বাবা-মা, এবার এসেছি তোমাদের কাছে।”
একাকীত্ব সবচেয়ে বড় শাস্তি নয়,
সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো —
“যাদের জন্য বাঁচতাম,
তারা আর পাশে নেই।”
আজ যারা বাবা-মা থেকে দূরে,
তাদের জন্য একটাই কথা —
👉 সময় থাকতেই ভালোবাসা প্রকাশ করো।
কারণ একদিন হয়তো তাদের ঘর থাকবে,
কিন্তু তারা থাকবে না।
